প্রজননতন্ত্রের কাজ

মাসিক ও মাসিক চক্র (menstruation)

একটি নিদিষ্ট নিয়মে জরায়ুর অভ্যন্তরের স্তরটি (endometrium) প্রতি মাসে ঝরে পড়াকে মাসিক বলা হয় । সাধারনত: মাসিক ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সে শুরু হয় এবং ৪৫ থেকে ৫২ বছর বয়সে বন্ধ হয়ে যায়।

মাসিক প্রক্রিয়া (menstrual process)

প্রতিমাসে জরায়ুর এ্যান্ড্রোমেট্রিয়াম বাড়তে থাকে, ধীরে ধীরে পুরু হয় এবং নিষিক্ত ডিম্ব গ্রোথিতকরণের জন্য প্রস্তুত হয়। যদি গ্রোথিতকরণ হয় সে ক্ষেত্রে নিষিক্ত ডিম্ব িএই স্তর থেকেই প্রথম কয়েকদিন প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায় । যদি ডিম্ব নিষিক্ত বা গ্রোথিত না হয় তবে এই পুরু স্তরটি ভেঙ্গে যেতে শুরু করে । জরায়ুর অভ্যন্তরের স্তরে যে রক্তনালী থাকে সেখান থেকে রক্ত ক্ষরণ শুরু হয় । এই রক্ত ও ভেঙ্গে যাওয়া স্তরের অংশগুলি একত্রে যৌনিপথে বের হয়ে আসে, একেই মাসিক বলা হয়ে থাকে ।

মাসিকের সময় কাল (menstrual period)

যে কয়েকদিন রক্তস্রাব হতে থাকে তাকে মাসিকের কাল বলে । স্বাভাবিক নিয়মে প্রতিমাসে ৩-৭ দিন রক্তস্রাব হয় । বেশীরভাগ মহিলার সাধারনত: ৫ দিন রক্তস্রাব হয়ে থাকে ।

মাসিক চক্র (menstrual cycle)

এক মাসিকের শুরুর দিন থেকে পরের মাসিকের শুরু পর্যন্ত সময়কে একটি মাসিক চক্র বলে । স্বাভাবিক মাসিকচক্র ২১-৩৫ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে । বেশীরভাগ মহিলার মাসিক ২৮ দিন বা একমাস পর পর হয়ে থাকে । অর্থাৎ ২৮ দিনে একটি মাসিক চক্র হয় । প্রতিমাসে যখন মাসিক হয় (মাসিক চক্রের প্রথম ৫ দিন) জরায়ুর অভ্যন্তরে স্তর ভাংঙ্গতে থাকে । ঠিক একই সময়ে FSH হরমোনের প্রভাবে ডিম্বাশয়ে কয়েকটি ছোট ডিম্বানু বড় হতে শুরু করে । এর মধ্যে একটি খুব দ্রুত বাড়তে শুরু করে এবং পরিপক্ক ডিম্বাণেুতে পরিনত হয় । এই ডিম্বাণু সাধারনত: মাসিক চক্রের ১৪ তম দিনে ডিম্বাশয় থেকে বেরিয়ে আসে, একে ডিম্বস্ফুটন (ovulation) বলে । ডিম্বস্ফুটনে LH হরমোনের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে । এই ডিম্বাণু নিষিক্ত হয়ে গ্রোথিত হলে গর্ভ ধারণ হয় এবং মাসিক বন্ধ হয়ে যায় । কিন্তু এই ডিম্বাণু যদি নিষিক্ত না হয় অথবা গ্রোথিত না হয় তবে জরায়ুর অভ্যন্তরের স্তরটি ভাঙ্গতে শুরু করে । ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু বের হয়ে আসতে সেখানে সাময়িক একটি গ্রন্থির মতো তৈরী হয় যাকে করপাস লুটিয়াম বলে । এই গ্রন্থি থেকে প্রজেস্টরন হরমোন নিঃসৃত হয় । গর্ভধারণ না হলে নির্দিষ্ট নিয়মে আবারো নতুন ডিম্বাণু পরিপক্ক হতে শুরু করে এবং নতুন চক্রের শুরু হয়।

রক্তস্রাবের পরিমান ও রং

স্বাভাবিক মাসিকের সময়ে স্বাভাবিক রক্তপাতের পরিমাণ প্রায় ৭০-৮০ মি,লি । স্বাভাবিক মাসিকের সময়ে দিনে প্রায় ৫/৬ বার স্যানিটারি প্যাড/কাপড় পাল্টাতে হয় । একেক মহিলার ক্ষেত্রে ঋতুস্রাব একেক রকম হতে পারে । কারো স্রাব অল্প সময় যেমন, ২ দিন হতে পারে,আবার কারো ৭ দিন পর্যন্ত চলতে পারে । রক্তস্রাব বেশী বা কম হতে পারে ।স্বাভাবিক রক্তস্রাবের রং টাটকা লাল,কালচে,বাদামী, পানির মত দানাদানা বা ছোট ছোট জমাট বাঁধা রক্তের আকারে হতে পারে ।

স্বাভাবিক মাসিকের ব্যবস্থাপনা

মাসিকের রক্ত ধারণ করার জন্য যে কাপড়/প্যাড ব্যবহার করা হয় তা অবশ্যই পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন । তা না হলে ব্যাকটেরিয়া সহজেই যৌনিপথ, জরায়ু এমন কি তলপেটে সংক্রমণ করতে পারে । যদি কাপড় ব্যবহার করে তবে কাপড় সাবান এবং পরিষ্কার পানি দিয়ে ধূয়ে রোদে শুকিয়ে নিতে হবে । ফেলে দেওয়া যায় এমন প্যাড/তুলা ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে তা নিরাপদ ভাবে ফেলতে হবে বা পুঁতে ফেলতে হবে ।

ডিম্বস্ফুটন (ovulation)

ডিম্বাশয়ে অবস্থিত ডিম্বাণু পরিপক্ক হলে ডিম্ব ডিম্বাশয় ভেদ করে বেরিয়ে আসে । এই প্রক্রিয়াটিকে ডিম্বস্ফুটন বলে । মেয়েরা প্রাপ্তবয়স্ক (menarche) হলে প্রতি মাসিক চক্রে একবার করে ডিম্বস্ফুটন হয় এবং এই প্রক্রিয়া রজ:নিবৃতির (menopause) পূর্ব পর্যন্ত চলতে থাকে ।

নিষিক্তকরণ (fertilization) ও গর্ভধারণ (conception)

এই পদ্ধতিতে পুরুষের শুক্রাণু ও মেয়েদের ডিম্বাণু মিলিত হয় জাইগোটা তৈরী করে। নিষিক্তকরণ প্রক্রিয়াটি হয় ডিম্বনালীর ভিতরে। নিষিক্ত ডিম্বটি ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে এবং ডিম্বনালী থেকে জরায়ুর গহ্বরে আসে। সাধারনত: নিষিক্তকরণের ষষ্ঠ দিনে জরায়ুতে গ্রোথিতকরণ শুরু হয় এবং ১০ থেকে ১১ দিনের মধ্যে এ প্রক্রিয়া শেষ হয়। নিষিক্ত ডিম্বটি জরায়ুতে গ্রোথিত হয়ে গেলে তাকে গর্ভধারণ বলে।

গর্ভধারণ প্রক্রিয়া

গর্ভধারণ একটি জটিল ধারাবাহিক প্রক্রিয়া । গর্ভধারণ হতে হলে –

  • একজন নারীর ডিম্বাশয় থেকে একটি ডিম্ব বের হয়ে আসতে হবে ।
  • ডিম্বাণুটি ডিম্ববাহী নালী দিয়ে জরায়ুর দিকে যেতে হবে ।
  • পুরুষের শুক্রাণু যাত্রাপথে ডিম্বাণুটির সাথে মিলিত হতে হবে ।
  • নিষিক্ত ডিম্বাণুটি জরায়ুর গায়ে গ্রোথিত হতে হবে ।

সন্তান ছেলে বা মেয়ে হওয়ার প্রক্রিয়া

একজন সন্তান ছেলে না মেয়ে হবে তা পিতা মাতার ক্রোমোজোমের (কোষের অভ্যন্তরে অতি ক্ষুদ্র দ্রব্য বা প্রতিটি কোষ তথা পুরো মানব দেহের বৈশিষ্ট নিয়ন্ত্রণ করে) উপর নির্ভর করে । একজন সুস্থ্য মানষের ৪৬ টি ক্রোমোজম থাকে ৪৪ টি অটোসম এবং ২টি সেক্স ক্রোমোজোম । একজন সুস্থ্য পুরুষের ক্রোমোজোম ৪৪, XY এবং একজন নারীর ক্রোমোজোম ৪৪, XX । যখন ডিম্ব ও শুক্রাণু পরিপক্ক হয়ে নিষিক্তকরণের জন্য প্রস্তুত হয় তখন প্রতিটি ডিম্ব ও শুক্রাণুতে এই ক্রোমোজোমের সংখ্যা অর্ধেক হয়ে যায়, এবং নিষিক্তকরণের পর আবার পূর্ণসংখ্যা প্রাপ্ত হয় অর্থাৎ একজন মানব শিশুর শরীরে অর্ধেক ক্রোমোজোম আসে মায়ের কাছ থেকে আর অর্ধেক আসে বাবার কাছ থেকে ; যাতে কিনা উভয় বংশের ধারাবাহিকতা রক্ষা হয় । এখন যদি ২২X শুক্রাণুর সাথে ২২X ডিম্বাণুর মিলন হয় ( ২২ X + ২২X = ৪৪ XX) তবে সন্তানটি হবে মেয়ে । আর যদি ২২Y শুক্রাণুর সাথে ২২X মিলন হয় (২২Y + ২২X = 44 XY) তবে সন্তানটি হবে ছেলে । যেহেতু বাবার শুক্রাণুতে দুটি X ক্রোমোজোম থাকে কাজেই সন্তান ছেলে বা মেয়ে হবে তা নির্ভর করে বাবার ক্রোমোজোমের উপর ।